অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে এক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে হত্যার অভিযোগে ৪৭ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি প্রবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ। নিহত দুই শিশুর বয়স ছিল ১২ ও ৫ বছর। তারা দুজনই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (১৮ মে) সন্ধ্যায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই জরুরি নম্বরে ফোন করে ঘটনার তথ্য জানান। পরে পুলিশ সিডনির ক্যাম্পবেল টাউন এলাকায় অবস্থিত বাসভবনে গিয়ে তার ৪৬ বছর বয়সী স্ত্রী ও দুই শিশুপুত্রের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাস্থলের ভয়াবহতা দেখে হতবাক হয়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও।
নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের অ্যাক্টিং সুপারিনটেনডেন্ট মাইকেল মরোনি জানান, ঘটনাস্থলে নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, “এটি ছিল অত্যন্ত সহিংস ও ভয়াবহ একটি ঘটনা।” পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে, যদিও কোনো আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার প্রায় ১০ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। পরিবারটির ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘরে থেকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন দুই সন্তানের দেখাশোনা করতেন। অন্যদিকে তার স্ত্রী চাকরি করে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন।
গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতাজনিত তিনটি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। মঙ্গলবার তাকে ক্যাম্পবেল টাউন আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে তার পক্ষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন আইনজীবী জাওয়াদ হোসাইন।
আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং তার মক্কেল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তবে অভিযুক্তের অতীতে পারিবারিক সহিংসতা, মাদকাসক্তি বা মানসিক সমস্যার কোনো ইতিহাস ছিল কি না—সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে পরিবারটির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পারিবারিক সহিংসতা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এমনকি সমাজকল্যাণ বা শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গেও তাদের কোনো পূর্ব যোগাযোগ ছিল না।
ঘটনার পর পুরো ক্যাম্পবেল টাউন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিহতদের বাড়ির সামনে ফুল রেখে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। এক প্রতিবেশী জানান, শিশুদুটিকে প্রায়ই বাইরে খেলতে দেখা যেত এবং পরিবারটিকে স্বাভাবিক বলেই মনে হতো। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড বিশ্বাস করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ক্রিস মিনস। নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার বলেন, “এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো সমাজের মতো আমিও গভীরভাবে ব্যথিত।” একই সঙ্গে তিনি পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারের পদক্ষেপ আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ ‘অপারেশন আমারক’ নামে পারিবারিক সহিংসতাবিরোধী বিশেষ অভিযানে প্রায় এক হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যেই প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড অস্ট্রেলিয়াজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আইনি কারণে ভুক্তভোগী শিশুদের সুরক্ষার স্বার্থে অভিযুক্ত ও নিহতদের নাম প্রকাশ করা হয়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।