পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়া জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও ধর্মঘটে অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩০ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালালে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, সোমবার (১৮ মে) গণপরিবহন ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীরা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবিতে বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে এবং টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
কেনিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিপচুম্বা মুরকোমেন জানিয়েছেন, সহিংস ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাজধানী নাইরোবি ছাড়াও বন্দরনগরী মোম্বাসা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। পাল্টা বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করে। এতে বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজধানীর বহু সড়ক প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়।
গণপরিবহন ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাস ও গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও অফিসগামীদের দীর্ঘ পথ হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। অনেক এলাকায় জরুরি সেবাও ব্যাহত হয়েছে।
পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। গত সপ্তাহে দেশটিতে খুচরা জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। এর আগের মাসেও ২৪ দশমিক ২ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো সরকারের দাবি, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে কেনিয়াকে বাড়তি চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তবে বিরোধী নেতা রিগাথি গাচাগুয়া সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষের ওপর অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি করে সরকার অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও চলমান সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছরে কেনিয়ায় কর বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়ে যাওয়ায় জনঅসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। এর আগেও সরকারবিরোধী আন্দোলনে সহিংস সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।