মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর প্রতি কৌশলগত আহ্বান জানান, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বার্তার মাধ্যমে ইরান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যের যুগ শেষের দিকে।
বার্তা সংস্থা সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাহরাইনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য নীতি বিষয়ক সিনিয়র ফেলো হাসান আল হাসান বলেন, ইরানের এই বক্তব্য মূলত উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশ্যে একটি কৌশলগত বার্তা। তিনি উল্লেখ করেন, তেহরান বোঝাতে চাইছে যে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে এবং এখন নতুন বাস্তবতা মেনে চলার সময় এসেছে।
খামেনির পোস্টে বলা হয়, “ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রতিবেশীদের বলছি, আপনারা এক অলৌকিক ঘটনা দেখছেন।” তিনি আরও আহ্বান জানান, পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সঠিক পক্ষে অবস্থান নিতে এবং ‘শয়তানদের’ মিথ্যা প্রতিশ্রুতি থেকে সতর্ক থাকতে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এখানে ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত চাপের মধ্যেও ইরানের টিকে থাকাকেই বোঝানো হয়েছে।
হাসান আল হাসান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সামরিক চাপে টিকে থেকে ইরান এখন নিজেকে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে দেখতে পাচ্ছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ প্রতিহত করা, ওয়াশিংটনকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব আরও জোরদার করার ফলে তেহরান এখন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এই আত্মবিশ্বাসই তাদের আঞ্চলিক নেতৃত্বের দাবি আরও জোরালো করছে।
এছাড়া খামেনি তার বার্তায় প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ‘যথাযথ সাড়া’ প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব ও সদিচ্ছা তখনই সম্ভব, যখন তারা ‘অহংকারী শক্তি’—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তির প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসবে। তার এই বক্তব্যে স্পষ্টভাবে পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান লক্ষ্য করা যায়।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খামেনির এই আহ্বান উপসাগরীয় দেশগুলো সহজভাবে নেবে না। হাসান আল হাসান বলেন, সংঘাত চলাকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশগুলো স্বাভাবিকভাবেই এই বার্তাকে সন্দেহের চোখে দেখবে। যুদ্ধের সময় তারা যেমন ইরানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় ছিল, তেমনি ভবিষ্যতেও ইরানের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সব মিলিয়ে, ইরানের এই কৌশলগত বার্তা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। তবে আঞ্চলিক দেশগুলো কীভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।