
সাভারের বহুল আলোচিত ৬ হত্যা মামলার অভিযুক্ত ‘বাংলা ভাই’ খ্যাত মশিউর রহমান সম্রাট, যার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ—তিনি কি একজন ঠান্ডা মাথার পেশাদার খুনি, নাকি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভোগা একজন রোগী? এই প্রশ্ন ঘিরেই আতঙ্ক, রহস্য ও কৌতূহল ছড়িয়ে পড়েছে তার নিজ গ্রাম মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামে।
সবুজ শেখ ওই গ্রামের পান্না শেখ ও মমতাজ বেগমের দ্বিতীয় সন্তান। জন্মস্থান গ্রামে হলেও শৈশব থেকেই তিনি বেড়ে ওঠেন ঢাকার সাভারে। তবে গ্রামে তার পরিচিতি ভিন্ন। এলাকাবাসীর ভাষায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ‘পাগল’ ও ‘নেশাগ্রস্ত’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, এক সময় সবুজ শেখের পরিবার এলাকাবাসীর জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পঞ্চায়েতের মাধ্যমে পরিবারটিকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। প্রায় এক দশক পর তারা আবার গ্রামে ফিরলেও সামাজিক সম্পর্ক আর আগের মতো স্বাভাবিক হয়নি।
তিনি বলেন, “সবুজ জুতার আঠা আর ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত ছিল। হাতে সাউন্ড বক্স নিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াত। যেকোনো বাড়িতে ঢুকে বিরক্ত করত। মানুষ একসময় বাধ্য হয়েই তাকে মেনে নেয়।”
স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগে সবুজ এক অটোরিকশাচালকের মাথা ফাটিয়ে অটো ছিনতাই করে নেয়। এরপর সে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তিন মাস আগে শেষবার গ্রামে এসে দোকানে চা খেয়ে টাকা না দিয়েই চলে যায়। এমনকি একসময় পুলিশের পোশাক পরে রাস্তায় ‘দায়িত্ব পালন’ করার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানান এলাকাবাসী।
এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সবুজের লাগামহীন আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে এলাকাবাসী তাকে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে। তবে ১৫ দিন পর কর্তৃপক্ষ জানায়, তার মধ্যে মাদকাসক্তির তেমন লক্ষণ নেই।
তিনি বলেন, “সবুজ একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করায় তাকে শান্ত রাখতে সিগারেট পর্যন্ত দিতে হতো। পরে তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।”
তবে পাবনা মানসিক হাসপাতাল থেকে সে পালিয়ে যায়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন ধরে সে মাঝে মাঝে এক-দুদিনের জন্য গ্রামে আসত এবং আবার নিখোঁজ হয়ে যেত।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সবুজ একাধিকবার থানায় গিয়ে নিজের বাবা ও এলাকার লোকজনের বিরুদ্ধে আজব অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করতেন, তাকে তার বাবা কিনে এনেছেন, তার প্রকৃত বাবা একজন ধনী ব্যক্তি। এমনকি বাবার বিরুদ্ধে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার অভিযোগও করেন—যা এলাকাবাসীর মতে সম্পূর্ণ বিভ্রমপ্রসূত।
সবুজের মা মমতাজ বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“আমার ছেলে মাদ্রাসায় পড়ত। কোরআন হিফজ প্রায় শেষ করছিল। হঠাৎ করেই মাথার সমস্যা শুরু হয়। হুজুর, ওঝা, ডাক্তার—সব করেছি। কিন্তু গরিব মানুষ, আর পারিনি।”
তিনি জানান, পাঁচ বছর কারাভোগ শেষে সাভারের কাশিমপুর কারাগার থেকে সরাসরি গ্রামে আসে সবুজ। তখন জানতে পারে তার স্ত্রী ও সন্তান তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এরপর তার মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।
এক চায়ের দোকানদার বলেন, “সে চা খেতে খেতে একা একা কথা বলত। আমরা তাকে পাগল হিসেবেই জানতাম। কয়েকদিনেই আমার দোকান থেকে পাঁচটা কাপ নিয়ে গেছে। ভয়ে কিছু বলিনি।”
সাভারের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মৌছামান্দ্রা গ্রামে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর একটাই দাবি—এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
স্থানীয়রা বলেন, “সবুজ যদি সত্যিই খুন করে থাকে, তার বিচার হোক। আর যদি কেউ তাকে ব্যবহার করে থাকে, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি তার মানসিক অবস্থা যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।”