
জুলাই বিপ্লবী ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে নতুন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল উপলক্ষে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ডিবিপ্রধান। তিনি বলেন, তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ফয়সাল করিম মাসুদ দুবাইয়ে নয়, বরং ভারতে অবস্থান করছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফয়সাল করিম মাসুদের দুটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওগুলোতে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে আছেন এবং হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ভিডিওগুলো সত্য নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি—এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান জানান, ভিডিওগুলো আসল হলেও ফয়সালের অবস্থান দুবাই নয়; তদন্তে তার ভারত অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবির তথ্যমতে, হাদি হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল চালক ছিলেন আলমগীর শেখ।
ডিবিপ্রধান জানান, এই মামলায় এখন পর্যন্ত ১৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পাঁচজন এখনও পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন—হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ, মোটরসাইকেল চালক আলমগীর শেখ, তাদের পালাতে সহায়তাকারী মানবপাচারকারী ফিলিফ স্নাল, হত্যার নির্দেশদাতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী এবং ফয়সালের বোন জেসমিন।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন পল্লবী এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী। ভবিষ্যতে তদন্তে আরও কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হবে বলেও জানান ডিবিপ্রধান।
ডিবি জানায়, শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন পরিচিত ও আলোচিত ব্যক্তিত্ব। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি সভা-সমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করতেন। এতে ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর পলায়নে সহায়তাকারী তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী ছিলেন পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ মনোনীত কাউন্সিলর। এসব রাজনৈতিক যোগসূত্র ও হাদির পূর্ববর্তী বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ডিবি নিশ্চিত হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরেই শরিফ ওসমান হাদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগে যাওয়ার পথে রিকশায় থাকা অবস্থায় শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলা চালানো হয়। পেছন থেকে মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্তের একজন তাকে গুলি করে। গুলিটি তার মাথায় বিদ্ধ হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং দুই দিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।