
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির খবর এসেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার আগে হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগর পেরিয়ে আসা ১৫টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার আগেই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ক্লিংকারসহ মোট প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে এবং বাকি তিনটি জাহাজ এই সপ্তাহের মধ্যেই বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব জাহাজের মধ্যে চারটিতে এলএনজি, দুইটিতে এলপিজি এবং বাকি নয়টিতে সিমেন্টশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ক্লিংকার রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও এসব চালান বাংলাদেশে পৌঁছানো জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যানুসারে, কাতার থেকে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ এবং ‘আল জাসাসিয়া’ নামের দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া ‘আল গালায়েল’ ও ‘লুসাইল’ নামের আরও দুটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। এসব জাহাজ কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে সংঘাত শুরুর দুই থেকে সাত দিন আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে।
এ বিষয়ে এলএনজি জাহাজগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান Uni Global Business Limited-এর জ্যেষ্ঠ উপমহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আলম বলেন, চারটি এলএনজি জাহাজের চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানো প্রায় নিশ্চিত। তবে ‘লিবারেল’ নামে আরেকটি এলএনজিবাহী জাহাজ এখনো হরমুজ প্রণালির ভেতরে রয়েছে এবং সেটি প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় আছে। ভবিষ্যতের চালান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে এলপিজি নিয়ে ‘সেভান’ নামের একটি জাহাজ রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। জাহাজটিতে রয়েছে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি, যা ওমানের সোহার বন্দর থেকে আসছে। এর আগে একই বন্দর থেকে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামের আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ যুদ্ধ শুরুর আগেই বন্দরে পৌঁছেছে, যাতে ছিল ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি।
এই দুই জাহাজের প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে Meghna Group of Industries-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি।
এর পাশাপাশি সিমেন্টশিল্পের জন্য ক্লিংকার, জিপসাম, চুনাপাথর ও পাথর নিয়ে আরও কয়েকটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। এসব জাহাজে প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার টন কাঁচামাল রয়েছে, যা উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পারস্য উপসাগর থেকে বাংলাদেশে জাহাজ আসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালি ব্যবহার করে ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ সাতটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ হয়। পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগর, আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়।
তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এতে বিশ্বজুড়ে তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর বড় অংশই জ্বালানি পণ্য। তাই প্রণালি ঘিরে পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অস্থির থাকলে ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।