
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী একাধিক বিয়ের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়াটি বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয় বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা নাগরিকদের কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না এবং এটি নারী বা পুরুষ—কারও অধিকার হরণ করে না।
‘ইশরাত হাসান বনাম রাষ্ট্র’ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ অভিমত দেন। সংশ্লিষ্ট আইনের ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদনটি গত বছরের ২০ আগস্ট খারিজ করা হয়। সম্প্রতি রায়টি প্রকাশিত হয়েছে।
রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারায় একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি পরিষদের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সালিশি পরিষদ গঠিত হয় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং স্বামী-স্ত্রীর প্রতিনিধিদের নিয়ে। তবে সালিশি পরিষদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়; ভুক্তভোগীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত সহকারী জজ দ্বারা সংশোধনযোগ্য।
আদালত আরও বলেন, সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বিয়ে সম্পন্ন হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। বরং এ ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করে, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা নারী নাগরিকদের কোনো মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে না। ফলে এ বিষয়ে জারি করা রুল যথাযথভাবে খারিজ করা হয়েছে।
রায়ে ১৯৯৭ সালের আলোচিত ‘জেসমিন সুলতানা বনাম মো. ইলিয়াস’ মামলার প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, বিদ্যমান বিবাহ বহাল থাকাকালীন সালিশি পরিষদের পূর্ব অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো বিয়ে করা আইন লঙ্ঘন হলেও, তা দ্বিতীয় বিবাহকে অবৈধ ঘোষণা করে না। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
হাইকোর্ট আরও বলেন, সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়াই বহুবিবাহ করলে স্ত্রীর দেনমোহর পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করে। একই সঙ্গে শাস্তির বিধান সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করবে।
রায়ে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার প্রসঙ্গও উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, বহুবিবাহের ক্ষেত্রে সাজার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ইসলামী আইন অনুযায়ী পুরুষের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ নয়। ফলে এই ভিন্নতা বৈষম্যমূলক নয়।
রায়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, তিউনিসিয়া ও তুরস্ক বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সালিশি পরিষদ চাইলে বহুবিবাহের অনুমতি নাকচ করতে পারে। তাই বর্তমান আইনটি সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং সংবিধান পরিপন্থীও নয়।
উল্লেখ্য, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান এই রিট দায়ের করেন। রায়ে হাইকোর্ট বলেন, এটি জনস্বার্থে দায়ের করা রিট এবং পিটিশনারের এমন আবেদন করার আইনগত এখতিয়ার রয়েছে।