
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঋণ পাওয়ার সুযোগ আরও সহজ করতে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বিদেশি ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ঋণ নিতে আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আলাদা অনুমতি প্রয়োজন হবে না। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব যাচাই–বাছাই এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সরাসরি ঋণ দিতে পারবে।
রোববার (১৫ মার্চ) এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, বিদেশি নিশ্চয়তার বিপরীতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থায়ন সহজ হবে। বিদেশি ব্যাংকের নিশ্চয়তা থাকলে ঋণ ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কারণ ঋণগ্রহীতা পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিদেশি গ্যারান্টির মাধ্যমে অর্থ পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। তবে বিদেশি গ্যারান্টি বা দেশের বাইরে অবস্থিত জামানতের বিপরীতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আগে কিছু বিধিনিষেধ ছিল।
নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ব্যাংক গ্যারান্টি বা স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) এর বিপরীতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে টাকায় ঋণ দিতে পারবে। এর ফলে সহজে অর্থায়ন পাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বিদেশি ব্যাংক গ্যারান্টি বা এসবিএলসি অবশ্যই শর্তহীন, অপরিবর্তনীয় এবং প্রথম দাবিতেই পরিশোধযোগ্য হতে হবে। এছাড়া এটি এমন কোনো বিদেশি ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইস্যু হতে হবে, যার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো রেটিং এজেন্সির কাছ থেকে সন্তোষজনক ক্রেডিট রেটিং রয়েছে। এই রেটিং ন্যূনতম বিবি রেটিং গ্রেড ১-২ সমতুল্য হতে হবে।
ঋণদাতা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব ঋণ নীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং দেশীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন মানদণ্ড অনুযায়ী এসব গ্যারান্টি গ্রহণযোগ্য কি না তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, বিদেশি ব্যাংক গ্যারান্টি বা এসবিএলসির বিপরীতে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় ঋণগ্রহীতা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোনো ফি, কমিশন বা আর্থিক সুবিধা বিদেশি গ্যারান্টিদাতাকে দিতে পারবে না।
ঋণ বিতরণের আগে ঋণদাতা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিশ্চিত করতে হবে যে গ্যারান্টি বা এসবিএলসির ক্ষেত্রে সুশাসন, বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া এবং আইনি কার্যকারিতা সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
এছাড়া ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান খেলাপি হলে এবং বিদেশি ব্যাংক গ্যারান্টি বা এসবিএলসি নগদায়নের প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আর্থিক সূচকের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা যাচাই করতে হবে।
এছাড়া প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ঋণের বিপরীতে নবায়ন করা ব্যাংক গ্যারান্টি বা এসবিএলসি লিয়েন রাখা যাবে। তবে সে ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অবস্থা উন্নত হয়েছে কি না—যেমন টার্নওভার, মুনাফা এবং নগদ প্রবাহ—তা নিশ্চিত করতে হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংক গ্যারান্টি বা এসবিএলসি অবশ্যই অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে আসতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাক-টু-ব্যাক বিদেশি গ্যারান্টি বা সমতুল্য নগদ জমার বিপরীতে এটি ইস্যু করতে হবে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, গ্যারান্টি নগদায়ন হলে সেই অর্থ দেশীয় ঋণগ্রহীতা এবং বিদেশি গ্যারান্টিদাতার মধ্যকার চুক্তির ভিত্তিতে ইকুইটি বিনিয়োগ হিসেবে রিপোর্ট করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়ন সহজ হবে এবং বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।