
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে আতঙ্কে অনেক মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি তেল কিনতে শুরু করেছেন। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অস্বাভাবিক ভিড় দেখা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তেল বিক্রির ওপর সাময়িক সীমা নির্ধারণ করেছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) এক বিজ্ঞপ্তিতে বিপিসি জানায়, আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফিলিং স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি জ্বালানি তেল বিক্রি করা যাবে না।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ লিটার জ্বালানি তেল দেওয়া হবে। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি) বা জিপ এবং মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত তেল নিতে পারবে।
এ ছাড়া পিকআপ ভ্যান বা স্থানীয় বাস প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। অন্যদিকে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবে।
বিপিসি জানিয়েছে, বাংলাদেশের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থির পরিস্থিতিতে কখনও কখনও আমদানি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে। এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত নিয়ে নেতিবাচক খবর ছড়িয়ে পড়ায় অনেক ভোক্তা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
ফলে স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ডিলাররাও আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সাময়িকভাবে বিক্রির সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নেওয়ার সময় গ্রাহকদের অবশ্যই রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। সেই রসিদে তেলের ধরন, পরিমাণ এবং দাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। পরবর্তীতে আবার তেল কিনতে হলে আগের রসিদ দেখাতে হবে। ডিলাররা সেই রসিদ যাচাই করে তেল সরবরাহ করবেন।
বিপিসি আরও সতর্ক করে জানিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করা যাবে না। ফিলিং স্টেশনগুলোকে তাদের জ্বালানি তেলের মজুত ও বিক্রির তথ্য নিয়মিতভাবে ডিপোতে জানাতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিদেশ থেকে নিয়মিত চালান আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান স্থাপনা থেকে সারাদেশের বিভিন্ন ডিপোতে রেল ওয়াগন ও ট্যাংকারের মাধ্যমে নিয়মিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই পর্যাপ্ত বাফার স্টক তৈরি হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে শুক্রবার ছুটির দিনেও উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পরীবাগ এলাকার মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে হয়ে শাহবাগ মেট্রোরেলের নিচ পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে দুপুরের দিকে কয়েকজন মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে তর্ক-বিতর্কও হয়। কে আগে তেল নেবেন—এ নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য উত্তেজনাও দেখা যায় এবং কয়েকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।
বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ঘটনা ঘটছে এবং ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এই সংঘাতের প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল সরবরাহ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত শেষ হয়ে যায়নি এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।