
ইসরায়েলের নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ডিমোনা পারমাণবিক চুল্লি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৬০ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবারের মতো এই পারমাণবিক স্থাপনার অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে। এরপর থেকে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অসংখ্য গবেষণা, বই এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিমোনা প্রকল্পের ইতিহাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক অ্যাভনার কোহেন। তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ “Israel and the Bomb” ছাড়াও অনুসন্ধানী সাংবাদিক সিমুর হার্শ, গবেষক জাকি শালোম এবং ইতিহাসবিদ আদম রাজ এই কর্মসূচির উৎস, বিকাশ এবং এর দীর্ঘদিনের গোপনীয়তা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এই ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ২০২৪ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক শ্যানি হাজিজারের প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ “The Atom and Me”। এই প্রামাণ্যচিত্রে ডিমোনা পারমাণবিক প্রকল্পের সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে, যা গবেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে এত গবেষণা ও বিশ্লেষণের পরও ডিমোনা প্রকল্প নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। প্রথমত, এই পারমাণবিক কর্মসূচির মোট ব্যয় কত ছিল। দ্বিতীয়ত, এত বিশাল অর্থের জোগান কোথা থেকে এসেছে।
হারেৎজের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৬১ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির সরকার গোপন ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ১৪০ থেকে ১৬০ মিলিয়ন জার্মান মার্ক ইসরায়েলে পাঠিয়েছিল। এই অর্থ সরাসরি প্রকাশ্যে না দিয়ে গোপন আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরো সময়কালে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ বিলিয়ন জার্মান মার্ক। বর্তমান অর্থমূল্যে এর পরিমাণ প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো বা ৫.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৮৯ সালে স্বাক্ষরিত একটি পরিশোধ চুক্তির মাধ্যমে এই ঋণ কার্যত অনুদানে পরিণত হয়। ফলে ইসরায়েলকে এই অর্থ ফেরত দিতে হয়নি।
যদি এই দাবি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উন্মোচন করবে। কারণ এতে বোঝা যাবে যে, ডিমোনা পারমাণবিক প্রকল্পের বড় একটি অংশ ইসরায়েলি করদাতা বা ব্যক্তিগত দাতাদের অর্থে নয়, বরং জার্মান সরকারের আর্থিক সহায়তায় গড়ে উঠেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তথ্য আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক নীতির আলোচনায় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।