
যুক্তরাষ্ট্র কখনো গুরুতর সংকটে পড়লে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো আদৌ পাশে দাঁড়াবে কি না—এমন প্রশ্ন তুলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকা খাটো করে দেওয়া তার সাম্প্রতিক মন্তব্যে ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফাঁকে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি সব সময়ই বলে এসেছি, আমাদের কখনো দরকার হলে তারা কি থাকবে? এটাই চূড়ান্ত পরীক্ষা। আমি নিশ্চিত নই। আমরা থাকতাম বা থাকব—কিন্তু তারা কি থাকবে?” তার এই বক্তব্য ন্যাটোর পারস্পরিক আস্থা ও ঐক্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব কমিয়ে দেখান। তিনি বলেন, “তারা বলবে, আফগানিস্তানে কিছু সেনা পাঠিয়েছিল। হ্যাঁ, পাঠিয়েছিল, কিন্তু তারা সামনের সারিতে ছিল না।” বরাবরের মতোই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় মিত্র দেশগুলোর ত্যাগকে গৌণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। প্রায় ২০ বছর ধরে চলা আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোর মিত্র দেশগুলোর মোট প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সেনা নিহত হন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৫৬ জন মার্কিন সেনা এবং ৪৫৭ জন ব্রিটিশ সেনা ছিলেন। জনসংখ্যার অনুপাতে অনেক ইউরোপীয় দেশের ক্ষতির হার যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কাছাকাছি ছিল। উদাহরণ হিসেবে ডেনমার্কের কথা বলা যায়—প্রায় ৫০ লাখ জনসংখ্যার দেশটি যুদ্ধে ৪০ জনের বেশি সেনা হারিয়েছে, যা অনুপাতগতভাবে বড় ত্যাগ হিসেবে বিবেচিত।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর প্রথমবারের মতো ন্যাটোর ঐতিহাসিক অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর হয়। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জোটের কোনো এক সদস্যের ওপর হামলা মানেই সকল সদস্যের ওপর হামলা। তখন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়েই ন্যাটো মিত্ররা আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে দাভোসেই সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানান ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে। ট্রাম্পের পাশেই বসে তিনি বলেন, “আপনি বলেছেন ইউরোপীয়রা যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে পাশে দাঁড়াবে কি না—আপনি নিশ্চিত নন। আমি আপনাকে স্পষ্ট করে বলছি, তারা দাঁড়াবে এবং তারা আফগানিস্তানে দাঁড়িয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতি দুইজন মার্কিন সেনার বিনিময়ে একজন করে অন্য ন্যাটো দেশের সেনা আর পরিবারের কাছে ফিরে আসেনি। আপনি যদি এটিকে গুরুত্বহীন ভাবেন, তাহলে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।”
ট্রাম্পের মন্তব্যে যুক্তরাজ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দলমত নির্বিশেষে ব্রিটিশ রাজনীতিকরা একে মিত্রদের প্রতি অপমানজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জন হিলি বলেন, “ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ মাত্র একবারই সক্রিয় হয়েছে, আর তখন যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে যুক্তরাজ্যসহ মিত্ররা সাড়া দিয়েছিল। আফগানিস্তানে ৪৫০ জনের বেশি ব্রিটিশ সেনা প্রাণ হারিয়েছেন।”
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এমিলি থর্নবেরি ট্রাম্পের মন্তব্যকে ‘চরম অপমান’ বলে উল্লেখ করেন। বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনকও বলেন, “মিত্রদের ত্যাগকে সম্মান করা উচিত, অবমূল্যায়ন নয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের ধারাবাহিক মন্তব্য ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করছে। ভবিষ্যতে কোনো বড় সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই সামরিক জোট কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে—সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।