
দেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সরকার একটি বিস্তৃত ১৮০ দিনের বিনিয়োগ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় মোট ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ সহায়তা জোরদার করা এবং নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৫ মার্চ) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে রোববার (১৪ মার্চ) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এই কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন সংস্থা (মিডা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপি)-এর পক্ষ থেকে পরিকল্পনাটি তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিডা, বেজা ও মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং পিপিপি-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী এই পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও গতিশীল করতে বিভিন্ন খাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, অবকাঠামো উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট কর্মপরিকল্পনার প্রায় ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ১৩টি উদ্যোগ অবকাঠামো শক্তিশালীকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে বন্দর আধুনিকায়ন, শিল্পপার্কে ‘রেডি-টু-ইউজ’ প্লট সম্প্রসারণ, নতুন ফ্রি ট্রেড জোন এবং ডিফেন্স ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা, পাশাপাশি জ্বালানি খাতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ।
এছাড়া বিনিয়োগ সহায়তা জোরদারের জন্য ৭টি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা মোট পরিকল্পনার প্রায় ৩০ শতাংশ। এই উদ্যোগগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করা এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিডা, বেজা, বেপজা, বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং পিপিপিএ—এই পাঁচটি সংস্থাকে একীভূত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনায় বিনিয়োগ উন্নয়নের জন্য আরও ৫টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মোট পরিকল্পনার প্রায় ২০ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে দেশের শিল্পখাতের বিস্তারিত ম্যাপিং করা, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশগুলো থেকে নির্দিষ্ট খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করা এবং নতুন বিনিয়োগ প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করা।
এছাড়া বাংলাদেশ–দক্ষিণ কোরিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করা, ‘বাংলাবিজ’ নামের একক বিনিয়োগসেবা প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৃহৎ কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের সমস্যার লক্ষ্যভিত্তিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে চীনে বিডার প্রথম বিদেশি কার্যালয় চালুর বিষয়টিও এই কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্লু ইকোনমি উন্নয়নের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, মেরিকালচার এবং রপ্তানিমুখী চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আশিক চৌধুরী বলেন, দেশের অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করা, দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বাস্তবায়নমুখী সংস্কারের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়ানোই সরকারের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে সহায়তা দেওয়াকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি যারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ১৮০ দিনের বিনিয়োগ কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।