
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রুদের ওভারসিজ অ্যালাউন্স (বিদেশি ভাতা) উত্তোলনকে কেন্দ্র করে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও সম্ভাব্য অর্থ পাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি নথিতে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম পরিবর্তন করে প্রায় ২০০ কেবিন ক্রুর বিদেশি ভাতা এক ব্যক্তির নামে ইস্যুকৃত একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো অর্থ লেনদেনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, গত ১৪ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুবাই স্টেশনের ১৯৬টি বিলের বিপরীতে মোট ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার আনুমানিক মূল্য ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকারও বেশি।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই বিপুল অঙ্কের অর্থ কেবিন ক্রু ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফ্লাইট স্টুয়ার্ড মো. আব্দুস শাকুর মুজাহিদের নামে ইস্যুকৃত একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। অথচ অতীতে প্রতিটি কেবিন ক্রুর নামে আলাদাভাবে ওভারসিজ অ্যালাউন্স বা প্রয়োজন অনুযায়ী অথরিটি বিল ইস্যু করার প্রচলিত ব্যবস্থা ছিল।
তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, ১৫ মে সকালে বিজি-২৪৮ ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গোয়েন্দা সংস্থার তল্লাশিতে আব্দুস শাকুর মুজাহিদের কাছ থেকে ১০ হাজার মার্কিন ডলার ও ২ হাজার দিরহাম উদ্ধার করা হয়।
একই ফ্লাইটের আরও কয়েকজন কেবিন ক্রুর কাছ থেকেও বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ করা হয়। সব মিলিয়ে উদ্ধার হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৮ হাজার ৩৬০ দিরহাম সমমূল্যের।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট চিঠিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, উত্তোলিত অর্থের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৭ দিরহামের কোনো গ্রহণযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই অর্থের বড় একটি অংশ দুবাইয়ের একটি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে হুন্ডি চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট এজেন্টদের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের কাছে সমপরিমাণ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা এখনো আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ এপ্রিল ১৬৮ জন কেবিন ক্রুর বিলশিট ইউনিয়নের নামে প্রস্তুত করা হয়। তদন্তকারীদের মতে, এই পদ্ধতি প্রচলিত আর্থিক বিধি ও নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অভিযোগ রয়েছে, ইউনিয়নের প্রভাব ব্যবহার করে বিল প্রস্তুত, অর্থ উত্তোলন এবং পরে ঢাকায় ইউনিয়নের কার্যালয়ের মাধ্যমে হুন্ডির অর্থ বিতরণের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগে প্রতিটি কেবিন ক্রুর নামে পৃথকভাবে বিদেশি ভাতার চেক ইস্যু করা হতো। কিন্তু সম্প্রতি সেই নিয়ম পরিবর্তন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছেন, কী কারণে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত—এসব বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থ বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে দাবি করা হয়েছে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অর্থ বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাম আসার পর সংস্থাটির এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলেও অভিযোগে নাম থাকা আব্দুস শাকুর মুজাহিদসহ অন্য সংশ্লিষ্টরা এখনো দায়িত্ব পালন করছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১৫ মে দুপুরে বিমান প্রশাসনিক ভবনে কেবিন ক্রু অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট অর্থ বিতরণের প্রস্তুতি চলছিল। তবে বিমানবন্দরে গোয়েন্দা তল্লাশির ঘটনার পর সেই কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
পরে অন্য একটি স্থানে ওই অর্থ বিতরণ করা হয়েছে বলেও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থনীতি ও আর্থিক অপরাধ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা Foreign Exchange Regulation Act, 1947 এবং Money Laundering Prevention Act, 2012 অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে অভিযোগের সত্যতা, দায় নির্ধারণ এবং অপরাধ প্রমাণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের এখতিয়ার বলে তারা উল্লেখ করেছেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে ভবিষ্যতে প্রতিটি কেবিন ক্রুর নামে পৃথকভাবে চেক ইস্যুর ব্যবস্থা পুনর্বহাল, অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ওভারসিজ অ্যালাউন্স পরিশোধ, পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেবিন ক্রু ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুস শাকুর মুজাহিদ বলেন, ১৯৬টি বিলের বিপরীতে তাঁর নামে ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহামের চেক ইস্যুর বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।
তিনি বলেন, “আমি বর্তমানে যাত্রী বোর্ডিংয়ের কাজে ব্যস্ত। পরে এ বিষয়ে কথা বলব।” অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বোশরা ইসলাম বলেন, কেবিন ক্রুদের ওভারসিজ অ্যালাউন্সকে কেন্দ্র করে হুন্ডির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে বিমানের কাছে কোনো তথ্য নেই।